Free Bangla Tutorial
যদি সেও লিখতে পারতো!
কেও একজন পেছন থেকে বললো- কেমন আছো নাজিম?
অল্প কিছুক্ষণ পেছনে তাকিয়ে জবাব দিলাম- জি, ভালো, আপনি?
খুব বিশেষ খেয়াল করলাম না। কি যেন ভাবছিলাম তখন।
লোকটি জবাবে কি বললো তাও ঠিক লক্ষ্য করলাম না।
যখন একটু সময় বিষাদময় মনে হয় তখনই ছুটে আসি শীতলক্ষ্যার পাড়ে। কিছু হালকা মৃদু বাতাসে যখন মনটা জুরিয়ে যায় তখন আবার ঘরে ফিরি।
লোকটি বললেন- নাজিম নদীর খুব কাছে বসলে তো বোধ হয় তোমার মনটা আরো ভালো লাগতো। চলো নদীর কাছে গিয়ে বসি।
এবার পেছন ফিরে তাকালাম। লোকটিকে আগে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না।
বললাম- জি মানে, নদীর পাড়ে একটি গরু মরা, ভাসছে। খুব দূর্গন্ধ।
দেখলাম লোকটি হাল্কা মুচকি হেসে উঠলেনা কিছুটা কষ্ট ছিলো সেই হাসিতে।
একটু পর্যবেক্ষণ করলাম লোকটিকে, বয়স্ক লোক। গায়ে ময়লা একটি জামা।
তিনি হয়তো খেয়াল করলেন, আমার দৃষ্টি তার জামার দিকে পড়েছে তাই তিনি এই ব্যাপারেই বলার আগ্রহ দেখালেন।
লোকটি- কি, আমার ময়লা জামা দেখছো?
আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।
লোকটি আবার বললেন- আচ্ছা নাজিম চলো, তোমার সাথে একটু যুক্তির খেলা খেলি।
আমি লোকটার ব্যাপারে কৌতুহলী হয়ে গেলাম। এই লোকটাকে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হয় না! তিনি আমাকে চেনেন কিভাবে? আর তিনি আমার সাথে যেই যুক্তির খেলা খেলতে চাচ্ছেন তাই ই বা কেন?
জিঙ্গেস করলাম- আপনি কি আমাকে চেনেন?
লোকটি এক গাল হেসে নিলেন। বললেন, বলো কি নাজিম? তোমাকে চিনবো না! তুমি তো ইদানিং একটু আধটু লিখছো, সেই খবর তো একটু আধটু পাই। তবে তোমার লেখার বানান গুলো কিন্তু একটু বেশী মাত্রায় ভুল হয়। ওটা নিয়ে পাঁচ লোকে পাঁচ কথা বলে।
আমার ব্যাপারে লোকটার কাছে এতো অনুসন্ধানী তথ্য পেয়ে খুব ভালো লাগলো।
জিঙ্গেস করলাম- আপনি কি আমার লেখা পড়েন?
লোকটি আবার হাসলেন- না’রে বাপু, আমি পড়তে পারি না।
আমি তো ধীরে ধীরে আরো আগ্রহী হয়ে উঠলাম এই লোকটির ব্যাপারে।
জিঙ্গেস করলাম- এই গুলো শুনলেন কার কাছ থেকে?
লোকটি- ওই যে নদীর পাড়ের যেই স্কুল গুলো আছে। সেই স্কুলের ছাত্র গুলো যখন নদীর পাড়ে আসে তখন ওরাই গল্প করে।
যাই হোক তোমার যুক্তি গুলো ভালো লাগে তাই তোমর সাথে বলছিলাম যুক্তির খেলা খেলবো।
আমি বললাম ঠিক আছে বলুন আপনার যুক্তি।
লোকটি বলতে শুরু করলো। আচ্ছা আমি আমার সেই যৌবনের শুরু থেকে অনেকের সেবা করে এসেছি, এমন কি এখনও করছি, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে এসে আমার গায়ে আজ যেই জামা সেটা এতো ময়লা কেন? এর জন্য কে বা কারা দায়ী?
আমি বললাম- এটা তো আমার পক্ষে বলা মুশকিল, আমি নিতান্ত বাচ্চা লেখক। কিন্তু এখানে এটা বলা যেতে পারে। আপনি সারা জীবন ধরে যাদের সাহায্য করে এসেছেন, তারা হয়তো স্বার্থপর।
আমি লোকটিকে জিঙ্গেস করলাম- আপনার নামটা কি জানতে পারি?
লোকটি- আমার নাম শিতল.....
নামটা পুরোটা শেষ করতে পারলেন না। আমি জিঙ্গেস করলাম- আপনি কি হিন্দু?
লোকটি- তা তো জানি না। লোকে আমাকে এই নাম দিয়েছে। আর সেই ভাবেই আমি এই নামে পরিচিত।
আমার বিস্ময় বাড়তেই লাগলো লোকটিকে নিয়ে।
এবার শিতল বাবু আবার আমার দিকে প্রশ্ন করলেন- আচ্ছা নাজিম, এক গ্লাস সরবত বানাতে কত চামচ চিনি লাগে?
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। তার পরও কিছুটা আন্দাজে উত্তরটা দিলাম- এ ধরেন, টেবিল চামচের ৪-৫ চামচ!
শিতল বাবু এবার বললেন- সেই সরবতে লেবু চিনি লবণ সহ নেড়ে পুরো সরবতটা বানাতে নিশ্চই ৫ মিনিট লাগবে?
আমি বললাম- হ্যাঁ, তাতো লাগবেই।
শিতল বাবু এবার ব্যাখ্যা করলেন- তাহলে এই নদীর সব পানি টুকু দিয়ে যদি সরবত বানাতে দেওয়া হয় তবে যেই সময় লাগবে, তা নিশ্চই নিতন্ত খুব কম নয়! আর যেই চিনি বা লেবু যা লাগবে তাও নিশ্চই কম নয়!
আমি বুঝতে পারলাম, বৃদ্ধ শিতল বাবু নদী দূষণ যে শুধু একদিনে হয় নি তাই বোঝাতে চেয়েছেন আর তাতে যেই পরিমাণ ময়লা মিশে আছে তার কথাও বুঝিয়েছেন।
এরপর শিতল বাবু আমাকে যেই অনুরোধটি করে বসলেন তা কিন্তু আমাকে আরো নাড়িয়ে দিলো।
শিতল বাবু- নাজিম, এই নদী নিয়ে কিছু একটা করো।
আমি তো ‘থ’। বললাম- আমি কি করবো?
শিতল বাবু- কি বলছো? কি করবা মানে? পান থেকে চুন খসলেই তো দেখি প্রেস ক্লাবের দিকে দৌড় দেয় মানুষ।
আমি অসহায় ভাবে জিঙ্গেস করলাম- আমি কি করবো? আমি একা প্রেস ক্লাবে গেলে কোন ব্যক্তি কি আমার কথা শুনবে?
শিতল বাবু- তুমি একা প্রেস ক্লাবে না গেলেও অন্তত কোন সামাজিক মাধ্যমে তো নদী বাঁচও নিয়ে একটা গল্প লিখতে পারো।
আমি তো অবাক হয়ে গেলাম বৃদ্ধের অনলাইন প্রিতি দেখে।
বললাম- দেখেন মুরুব্বি, এখানে কষ্ট করে গল্প লিখা যায় কিন্তু যারা এইগুলা পড়ে তারা বিনোদন হিসেবে পড়ে। এটা নিয়ে কেও ভাবে না।
শিতল বাবু- সেটা আমি জানি। এই তো কিছু দিন আগে আমার পাশে বসে কতগুলো ছেলে সমানে লাইক আর কি যে হিজিবিজি কমেন্ট করছিল। কিন্তু এতো বড় বড় লেখা গুলো পড়েও পর্যন্ত দেখলো না। অনেক আশায় বসে ছিলাম। তারা হয়তো শব্দ করে পড়বে। কিন্তু পড়লো না। পাশের একজন কে বলতে শুনেছি কিরে, তুই আমার পোস্টের মধ্যে ‘Add me’ লিখে কমেন্ট দিলি কেন? তা নিয়ে তাদের মধ্যে আহ্ কি ঝগড়া!
বলতে বলতে হেসে উঠলেন শিতল বাবু।
আমি বললাম- আপনি হাসছেন?
শিতল বাবু বললেন- হ্যাঁ হাসছি। নাজিম, তুমি যখন কিছু লিখবে তখন তা যে শুধু ঐ ‘Add me’ দের কাছে পৌছাবে তা কিন্তু নয়! আর সফলতা একদিনে আসবে তাও কিন্তু নয়।
আমি- জিঙ্গাসু ভঙ্গিতে বললাম- আচ্ছা মনে করেন, আমি একটা কিছু লিখলাম। আর সেটা ‘আমরা কাঞ্চন পৌরবাসী সংগঠন’ এর গ্র“পে বা পেজে পোস্ট করলাম তাহলে শুধু কাঞ্চনের লোকদের বা বরংচ আশেপাশের কিছু লোকদের নজরে আসবে। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীতো অনেক বড়।
শিতল বাবু- তুমি বাপু, এখনো বোকাই রয়ে গেলে। মনে করো তোমার জ্বর এসেছে তোমাকে সেলাইন পুশ করতে হবে, তাহলে কি তোমার সারা দেহে পুশ করতে হবে! আগে ক্ষূদ্র এক জায়গা থেকে শুরু করো না! পরে যদি কোমায় পাঠাতে হয় তখন পরের টা পরে দেখা যাবে।
আমি বুঝতে পারছিলাম শিতল বাবু নদীটাকে নিয়ে খুব ভাবেন। ভাবছিলাম, ওনি যদি লিখতে-পড়তে জানতেন তবে গল্পটা তাঁকে দিয়েই লিখানো যেতো। প্রয়োজন হলে না হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা একাউন্ট করে দিতাম!
যাক গল্পের ব্যাপারে তাঁর কাছে অভিজ্ঞতা নিতে চাইলাম। বললাম- আচ্ছা বলুন তো কি লিখা যায়?
প্রশ্নের জবাবে শিতল বাবুর কাছে যা জানলাম তাতে নিজেকে আসলেই খুব বোকা মনে হলো।
শিতল বাবু বললেন- আচ্ছা একটু আগে যে বললাম ১ গ্লাস সরবতের কথা। এখন বলো তো তোমার গ্রামের নদীর পাড়ের কত জন মানুষ দৈনিক ১ গ্ল্যাস সরবত পান করে?
আমি বললাম- সবারটা তো জানি না, তবে আমি তো কাঞ্চনের কেন্দুয়া গ্রামের জেলে পাড়াতে থাকি। তারা তো খুব দরিদ্র, দিন আনে দিন খায়। তাদের কাছে অল্প টাকার সরবতটাও এতো সহজ নয়।
শিতল বাবু- এই তো এবার তোমার জবাবটা তুমিই খোজে পাইছো। আর সেই জেলে পাড়ার লোক গুলো কিন্তু এই নদীর উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। যারা আদৌ জানে না, প্রেস ক্লাব কি! বা এটাও জানে না তাঁদেরও যে বেঁচে থাকার সামাজিক অধিকার আছে।
ঠিক তখন পেছন থেকে ডেকে উঠলো এক বন্ধু- নাজিম কি করছো এখানে?
আমি আমার সেই বন্ধুকে শিতল বাবুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলাম।
আবার শিতল বাবুর দিকে তাকাতেই তাকে আর খোজে পেলাম না।
বন্ধু বলল- কি খোজছ নাজিম?
আমি বললাম- শিতল. . . . .
বন্ধু বললো- হ্যাঁ শীতলক্ষ্যা, তাতে কি হয়েছে?
আমি বললাম- ময়লা জা. . . মা. .. . . .
বন্ধু বলল- শীতলক্ষ্যার পানি গুলো খুব ময়লা।
আমি যখন হতাশ হয়ে নদীর দিকে চেয়ে আছি তখন আবার নদী থেকে ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠলেন শিতল বাবু।
ইশারায় আমাকে বললেন গল্পটা কিন্তু লিখ। আমার জামাটা খুবই ময়লা।
বুঝতে আর বাকি রইল না শিতল বাবু-ই আমাদের শীতলক্ষ্যা।